শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

কথা ছিল মিথুন ভাই

নিউজ ডেস্ক / ৩১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

পহেলা ফেব্রুয়ারি। ঢাকা দুই সিটির নির্বাচন ছিলো। তাই সকালেই বাসা থেকে বের হয়েছি। ভিকারুননেসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভোটকেন্দ্রে অপেক্ষা করি কিছু সময়। কারণ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ কেন্দ্রেই ভোট দেবেন ও গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেবেন। অপেক্ষার পর তার প্রতিক্রিয়া নিয়েই হেঁটে আসি সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ)। বাগানে বসে শিহাবকে চা দিতে বলেই মোবাইল চাপ দিয়ে ফেসবুক খুলি। বিভিন্ন গ্রুপে ড. কামাল হোসেনের প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য। কিন্তু গ্রুপে যাওয়ার আগেই নিউজ ফিডে ভেসে ওঠে দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার কবির আহমেদ ভাইয়ের স্ট্যাটাস ‘দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার মিথুন মাহফুজ আর নেই’। মোবাইল মনিটরে আটকে গেলো চোখ। থমকে গেল আমার চিন্তাগুলো। ভুলে গেলাম ড. কামাল হোসেনের প্রতিক্রিয়া। মিথুন ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি সত্য-মিথ্যা যাচাই করার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সময়ে যারা কর্মরত তাদের ফেসবুক প্রোফাইলে খুঁজতে থাকি। আর ভাবছি খবরটি হয়তো মিথ্যা। কিন্তু না-যার প্রোফাইলে যাই, দেখি সেই একই স্ট্যাটাস দিয়েছেন মিথুন মাহফুজ নেই।

আমার ভাবনাটাই মিথ্যা প্রমাণিত হলো। যখন একটি নিউজ পোর্টালে মিথুন ভাইয়ের মৃত্যুর খবর দেখলাম, ‘দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার মিথুন মাহফুজ শনিবার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সকাল ১০টা ২০মিনিটে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মরহুমের ছোট ভাই রিপন জানিয়েছেন, সকালে বড় ভাই (মিথুন মাহফুজ) অসুস্থবোধ করেন। বিষয়টি ফোনে আমার ভগ্নিপতিকে জানাই উনি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে পর্যবেক্ষণ করে মৃত ঘোষণা করেন।’

খবরটির বিস্তারিত আর পড়তে পারলাম না। চোখের পাতা ভারী হতে লাগলো। আস্তে-আস্তে কপোল বেয়ে ঝড়তে থাকলো পানি। পানি আটকানোর চেষ্টাই করলাম না। হয়তো ঝড়ে পড়াটাই জরুরি ছিলো। চোখের পানিতে মোবাইলের মনিটর ভিজে গেলো। ঝাপসা হলো দৃষ্টি।

মনে পড়ে গেলো অতি আবেগী এই মানুষটার কথা।

তখন আমি দৈনিক সংবাদের রিপোর্টার। প্রায় প্রতিদিন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ক্যান্টিনে দুপুরের খাবার খাই। তাই দুপুর হলেই ডিআরইউতে দেখা হতো মিথুন মাহফুজ ভাইয়ের সাথে। পরিচয় অনেক দিন হলেও ধীরে-ধীরে আন্তরিকতা গাঢ় হতে থাকে কবিতা নিয়ে আলোচনায়। সাংবাদিকতা নিয়ে কথা খুব হয় না। কথা হয় শিল্প সাহিত্য নিয়ে। তিনি নিঃসন্দেহে বড় মাপের সাংবাদিক। মুহূর্তে মানুষের মনে জায়গা করে নেন তিনি। মাঝে মধ্যে ফোন দিয়ে জানতে চায় নতুন কবিতার খবরও। তিনিও লেখেন। লেখা শেষ হলেই পড়ে শোনান কবিতাটি। আর হাসতে হাসতে বলেন আমার কবিতার কোনো পাণ্ডুলিপি নেই। আর হবেও না।

আমি প্রায় বলতাম। একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। সামনের বইমেলায় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করবো। প্রকাশনীগুলোতে আমার বেশ জানাশোনা আছে। তিনি শোনেন আর হাসেন, আমলে নেন না। সব কিছুই তেমন উদাস না হলেও নিজের প্রতি শতভাগ উদাস ছিলেন। অনিয়মিত খাওয়া, ঘুম ছিল নিত্যদিন।

একদিন সকাল বেলা ফোন করেন মিথুন ভাই।

হ্যালো- কোথায় আছেন কবি?

আমি তো বিএনপির নয়াপল্টন অফিসে।

শোনেন, আজ দুপুরে ডিআরইতে এক সাথে খাবো। একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে। দ্রুত চলে আসেন।

বিএনপির সংবাদ সম্মেলন শেষ করে আমি যথাসময়ে হাজির হলাম। দেখি মিথুন ভাই আগেই এসেছেন। দুজনেই বাগানে বসি। তখন সুলায়মান চা দিতো। আমাকে বললো, এই সুলায়মানের ছোট ভাই স্কুলে পড়ে। ওর ভাইয়ের স্কুলে যাওয়ার জন্য একটা সাইকেল প্রয়োজন। কি করা যায় বলেন তো? এই কথা বলেই সুলায়মানকে ডাক দিলো। সুলায়মান সামনে এলো। মিথুন ভাই বললো, কবিকে চা দে, আর তোর ভাইয়ের সাইকেল আমি কিনে দেবো। তুই আর টেনশন করিস না। এরপরেই আমাদের আলোচনা শুরু হলো। চায়ের সাথে আড্ডা। কথার ফাঁকে জানায়, আমাদের সময় নতুনভাবে শুরু হচ্ছে। সম্পাদক হিসেবে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। নতুন লোকজন নিচ্ছেন, বিএনপি বিটেও লোকজন নেবে। আপনিও যোগাযোগ করেন। বেশ ভালো বেতন দিচ্ছে। মিথুন ভাইয়ের কাছে এমন খবর পেয়ে ভালো লাগলো। দুপুরে এক সাথে খেয়ে যে যার অফিসে চলে যাই।

কিছুদিন পর ডিআরইউর বাগানে বসে চা পান করতে সুলায়মানকে জিজ্ঞাসা করলাম। মিথুন ভাই সাইকেল কিনে দিয়েছে কী? সুলায়মান প্রাপ্তির হাসি হেসে বলল- মিথুন স্যার খুব ভালো মানুষ। উনি টাকা দিয়েছেন। গ্রামের বাজার থেকে সাইকেল কিনে নিয়েছি। শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। এ ছাড়াও আমার জানামতে উনি অনেককেই সাহায্য সহযোগিতা করতেন। কিন্তু ওনার মনের গহীনে একটি অস্পষ্ট কষ্ট ছিলো। সহজেই বলতেন না সে কথা।

কর্মব্যস্ততায় চলে যায় দিন। দেখা হয়, আড্ডা হয়। মোবাইলেও কথা হয়। সংবাদ ছেড়ে আমি যোগদেই দৈনিক মানবকণ্ঠে। পুরাতন পত্রিকা নতুনভাবে বাজারে আসার প্রস্তুতি। নতুন অফিস গুলশান-১ নং সেকশনে। কাজের চাপও বেশি। মিথুন ভাইয়ের সাথে আগের মতো আর দেখা হয় না। এ নিয়ে মোবাইলে কত অভিযোগ। দেখা না হওয়ায় অনেক কথা নাকি জমা হয়ে থাকে। তবুও এভাবে কাটতে থাকে দিন।

সহসা এক রাতে ফোন দিল মিথুন ভাই..

হ্যালো কবি

জি বলুন ভাই।

আজ কবিতা লিখেছি।

তাহলে শুনতেই হয়।

হুম পড়ছি…

কবিতাটি শোনালো। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। অনুভূতিও প্রকাশ করলাম। কিন্তু আমার অনুভূতি শুনে সন্তুষ্ট হলেন না তিনি। শুরু হলো ইনিয়ে বিনিয়ে নানান প্রশ্ন। আপনার মন খারাপ কেনো? কী হয়েছে কবি?

আমি আর আড়াল না করেই বললাম। ভাই অফিসে সিনিয়র ভাইয়ের আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছি। টানা ক’দিনে তার আচরণে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যে কোনো দিন চাকরি ছেড়ে দিতে পারি। এ জন্য মনটা বেশ খারাপ।

আমাকে সাহস দিয়ে বললেন, টেনশন নেবেন না কবি। ভালো না লাগলে ছেড়ে দিন। আর ‘আমাদের সময়ে চেষ্টা করুন। আমাদের সম্পাদক শাহরিয়ার ভাইও কবি, আপনিও কবি। চেষ্টা করেন সুযোগ হতে পারে। আর বিএনপি বিটের প্রধান আনোয়ার চৌধুরী ভালো মানুষ। তাকে প্রয়োজনে আমিও বলমু।

অনেক মনোবল পেয়ে বললাম, ভাই বিএনপি বিটে যে  ক’জন সিনিয়র বড় ভাই খবর লেখেন তার মধ্যে আনোয়ার চৌধুরীর লেখার ভক্ত আমি। তার লেখার প্রাঞ্জলতা আমাকে মুগ্ধ করে। ছোট ছোট শব্দের গাথুনীতে লেখা নিউজগুলো বেশ তথ্য নির্ভর থাকে। তার কাছে কাজ শিখতে পারলে আমার আগামী দিনে সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার সুগম হতো। কথা বলা শেষ হলো। আমি ওই রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম। সকালে মানবকণ্ঠ অফিসে গিয়ে চাকরি ছেড়ে দিলাম।

ফোন দিলাম মিথুন ভাইকে। আমাকে আনোয়ার চৌধুরীর নম্বর দিলেন। নম্বর নিয়ে ফোন দিলাম। পরে বিটের সিনিয়র বড় ভাই মামুন স্ট্যালিনকে দিয়েও সুপারিশ করলাম। আনোয়ার চৌধুরী ভাই কিছুদিন পর ডেকে নিলেন। আমার চাকরিও হয়ে গেল। যোগদান করি আমাদের সময়ে।

আল্লাহ অশেষ রহমত আর নিয়তির খেলায় আমার বসার ডেক্স হলো মিথুন ভাইয়ের রুমে। ওই রুমে রাজনৈতিক বিট চিফ আনোয়ার চৌধুরী, বিএনপি বিটের সিনিয়র রিপোর্টার মামুন স্ট্যালিন, নির্বাচন কমিশন বিটের সিনিয়র রিপোর্টার মাহফুজ স্বপন, ক্রাইম বিটের চিফ শাহজাহান আকন্দ শুভ, ক্রাইম রিপোর্টার সাজ্জাদ মাহমুদ খান, পরে আসেন শাহরিয়ার জামান দিপ ও হাবিব রহমান। অর্থনৈতিক বিটের চিফ শফিকুল ইসলাম, অর্থনৈতিক বিটের সিনিয়র রিপোর্টার আবু আলী, আবদুল্লাহ কাফি ও দেলোয়ার মহিন। পাশের রুমে বসতেন বিশেষ প্রতিনিধি মরহুম সাইফুল ইসলাম তালুকদার, সিনিয়র রিপোর্টার আবুল বাসার নুরু, দুলাল হোসেন মৃধা, তাওহীদুল ইসলাম, রাজু হামিদ, রেজাউল করিম প্লাবন, সালমান তারেক শাকিল, আসাদুর রহমান, মেজবাহ শিমুল, লুৎফর রহমান কাকন ও শাহেদ বাপ্পী।  লেখার পাশাপাশি কত যে খুনসুটি হতো। তবে, মিথুন ভাই ছিলো বেশ মজার মানুষ। অফিসের কোন সহকর্মীর সাথে তার বিরোধ ছিলো না।  কিছুদিন পর আমার বসার ডেক্স হয় মিথুন ভাইয়ের পাশেই। এনিয়ে মিথুন ভাই কি যে খুশি তা বলার অপেক্ষা রইলো না। আনোয়ার ভাইকে বিশেষ ধন্যবাদ দিলো। আর আমাকে অফিসের নানাবিধ বিষয়ে বুঝাতে শুরু করলো। আমারও জানার খুবই প্রয়োজন ছিলো। শুরু হলো একসাথে বসে আড্ডা লেখা, গল্প কবিতা, গান আর কত বিষয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা। কেটে যায় দিন সপ্তাহ মাস আর বছর। এর মাঝে ঘটে যায় নিত্য নতুন জীবনের ঘটনা। নিউজ লেখার ফাঁকে অফিসের নিচে চায়ের দোকানে আড্ডা। আর সকাল বেলা অফিসের মিটিং নিয়ে কত খুঁনসুটি যে হতো। সম্পাদক মহোদয়ের চাপিয়ে দেওয়া কাজ নিয়েও সমালোচনা করতাম দুজনে। তবে, সাবধান থাকতাম কেউ যেনো না শোনে। কিন্তু এ মানুষটা জীবনে অনেক উত্থান-পতনের গল্প চাপা দিয়ে রাখেন। ব্যক্তি জীবনে অনেক বড় ঝড়ের কবলে পড়েন। তছনছ হয়ে গিয়েছিল জীবনের সাজানো স্বপ্ন। দীর্ঘশ্বাস তার নিয়তির ওপর। সে বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে চাই না।

বিভিন্ন ঘটনার এলোমেলো ঢেউয়ে আমাদের সময় ছাড়তে হয়। যেদিন শেষ অফিস, সেদিন সারাদিন ও রাত ৯টা পর্যন্ত আমার সাথে কোনো কথা বলেনি। চাকরি ছেড়ে বেকার হচ্ছি আমি। আর সেই শোকে কাতর মিথুন ভাই। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হবো, এটা জেনে উনি আগেই বের হয়েছেন। যাতে ওনার কাছ থেকে অফিসিয়ালি বিদায় নিতে না পারি। কতটা ভালোবাসতো আমাকে আমিও সেইদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এরপরও নিয়মিত কথা হতো।

আমাদের সময় ছাড়ার বছর খানেক পর। গভীর রাতে ফোন দিলো। প্রথম কলেই আমি রিসিভ করি। ভয় পেয়েছিলাম কোনো সমস্যা কি না?

হ্যালো কবি। জানি ঘুমাননি। কি করেন?

আমি একটি উপন্যাস লিখছি। কি খবর বলেন?

মনটা ভালো নেই।

কেন?

আজ এতদিন পর মনে হচ্ছে আপনার সঙ্গে আমাদের অফিস ও আমরা অবিচার করেছি।

কেন এমন মনে হলো?

শোনেন, সালমান তারেক শাকিল বিয়ে করলো। আমরা সবাই মিলে তাকে ভালো ধরণের উপহার দিলাম। আর আবুল বাসার নুরু ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য আমরা সবাই মিলে মোটা অংকের টাকাও দিলাম। অথচ আপনার বিয়ে হলো অফিস কিংবা আমরা কেউ কোন গিফট করলাম না। তাই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। যদিও গিফটের বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ অনুযোগ নেই। তবুও ওই রাতে মিথুন ভাইয়ের মুখে কথাগুলো শুনে বেশ ভাবিয়েছে আমাকে।

তারপর প্রায় রাত-বিরাতে ফোন দিতো মিথুন ভাই। কথা হতো ঢের সময় ধরে। মনের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো বলে হালকা হতাম দুজনে। সহকর্মী ভাই বন্ধু হিসেবে মিথুন মাহফুজ ছিলেন অনবদ্য। এই ভালো মনের মানুষটা মুহূর্তে চোখের আড়াল হলো। কেন মেনে নিতে হবে মিথুন মাহফুজ আর নেই। জানেন-মিথুন ভাই। আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেইনি ‘সাংবাদিক মিথুন মাহফুজ আর নেই’। কেনো স্ট্যাটাস দেব? আপনার সঙ্গে কত কাজ করবো। কত পরিকল্পনা আছে। আরো অনেক কথা ছিল মিথুন ভাই …

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও গীতিকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ