বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৮:২১ অপরাহ্ন

অল্প স্বল্প গল্প পর্ব-২

নিউজ ডেস্ক / ৪৯৮ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২২ জুন, ২০২০

 

প্রতি মাসে প্রকাশিত হয় ‘বেলা অবেলা’। মাস ঠিক থাকলেও দিনক্ষণ ঠিক থাকে না। দিনক্ষণ নির্ভর করে আমার বেতনের ওপর। এবারের সংখ্যা প্রকাশিত হলেও বিতরণ কাজে জট লেগে গেল। যদিও বিতরণগুলো আমি নিজেই করি। অফিসে কাজের চাপ থাকায় সঠিক সময়ে কলকাতায় ‘বেলা অবেলা’ পাঠাতে পারিনি। বিকেলে অফিসে বসে প্রতিবেদন তৈরি করছি। হঠাৎ কলকাতার কবি ও সম্পাদক নরেশ মণ্ডল দাদা ফেসবুকে ম্যাসেজ দিলেন। পত্রিকা পাঠাতে পারছি কি-না? বললাম দাদা পাঠানোর চেষ্টা করছি। তবে, প্যাকেট বহন করার মতো এমন মহৎ মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি বললেন, আগামীকাল বাংলাদেশ থেকে লেখক ড. তপন বাগচী কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে আসবেন। দেখ তাকে পত্রিকাগুলো দিতে পার কি-না?
মনে সাহস পেলাম। নব্বই দশকের শীর্ষস্থানীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও শিশুসাহিত্যিক ড. তপন বাগচী। বর্তমানে বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। তার লেখাও ‘বেলা অবেলা’য় প্রকাশিত হয়েছে। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করি। তিনি পত্রিকার প্যাকেট বহন করে কলকাতায় নিয়ে যেতে রাজি হলেন। তবে আগামীকাল বাংলা একাডেমিতে গিয়ে পৌঁছে দিতে হবে।
পরদিন দুপুরে সেগুনবাগিচায় আমার প্রাণের সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ক্যান্টিনে খেয়ে বাংলা একাডেমির দিকে রওয়ানা হই। একাডেমির নতুন ভবনে বসেন ড. তপন বাগচী। তার রুমে প্রবেশ করে দেখি কয়েকজন ভদ্রলোক দাদাকে ঘিরে বসে আছেন। আমাকে দেখে দাদা সবার সঙ্গে পরিচয় করে দিলেন। আমি দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে মোলাকাত করি। দাদা খুবই ব্যস্ত সময় পার করছেন। কারণ, সন্ধ্যার ফ্লাইটে কলকাতা যাবেন। তবুও দাদা আপ্যায়ন করালেন। এরপর দাদাকে পত্রিকার প্যাকেট দেই। উপস্থিত সবার হাতে এক কপি করে ‘বেলা অবেলা’ দিলাম। সবাই পত্রিকা উল্টে-পাল্টে দেখতে দেখতে বেশ প্রসংশাও করলেন।
এর মধ্যে একজন বেশ জনপ্রিয় কবি আরমান (ছদ্মনাম) ভাই। আমাকে বললেন আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আমি দাদার সঙ্গে কথা বলা শেষ করে বিদায় নিয়ে বের হলাম। আমার সঙ্গে বের হলেন সেই জনপ্রিয় কবি আরমান সাহেব। দু’জনেই লিফট চেপে নিচে এলাম। আরমান সাহেব বললেন চলেন পুকুরপাড়ে বসি। আমিও রাজি হলাম। পুকুরপাড়ে বসার পর আরমান সাহেব কথা বলা শুরু করলেন। ওনার লেখালেখি জীবনের ইতিহাস। আমি শুনছি আগ্রহ ভরে। প্রথম পরিচয় আগ্রহ না দেখালে বিরক্ত হবে। একপর্যায়ে আমার ফেসবুক আইডি নিয়ে রিকোয়েস্ট পাঠালেন। আমিও গ্রহণ করলাম। এরপর ওনার মোবাইলে ফটোগ্যালারিতে থাকা ছবিগুলো দেখাতে শুরু করলেন। আর প্রতিটি ছবির ক্যাপশন উনি মুখে বলা শুরু করলেন। ছবি এবং ক্যাপশন মিলে কমপক্ষে শতাধিক পুরস্কার পেয়েছেন কবি-সাহিত্যিক হিসেবে। আমারও খুব ভালো লাগল এত বড় মাপের সাহিত্যিকের সঙ্গে বসে আড্ডা দিতে। এমনকী তার মুখে তার জীবন সম্পর্কে জানতে। এরপর শুরু করলেন কোন কবি কেমন তার সম্পর্কে বলার। এবার বিনয়ের সঙ্গে আটকে দিয়ে বললাম- এসব অন্যদিন শুনব। আজ অফিসে যেতে হবে।
তিনি হালকা হোঁচট খেয়ে বললেন, বেলা অবেলা আগামী সংখ্যা কবে বের হবে? আমি বললাম এই তো আগামী মাসের যে কোনো দিন।
তাহলে আগামী সংখ্যায় আমার একটি কবিতা ছাপাবেন। এই বলে মোবাইল হাতে নিয়েই বাটন টিপ দিয়ে বললেন, দেখেন তো আপনার ফেসবুকে ম্যাসেঞ্জারে কবিতাটা গেছে কি না। দেখলাম চলে এসেছে। এবার মোবাইল নম্বর সেইভ করে নিলেন। তারপর হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম। উনি গেলেন শাহবাগের দিকে। আর আমি চলে আসি অফিসে ।
অফিসের কাজ শেষ করতে না করতে ফোন এলো।
হ্যালো আমি কবি আরমান বলছি। আপনার পত্রিকাটা পড়লাম। অনেক সুন্দর পত্রিকা করেন আপনি। লেখাগুলোর মান অনেক উন্নত। আর বেশ নামি-দামি লেখকের লেখা ছাপানো হয়েছে। লেখার সঙ্গে প্রচ্ছদগুলো বেশ চমৎকার হয়েছে।
তা ভাই আমার কবিতাটা কি দেখেছেন? আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে তো?
এত তেল-চর্বি মাখা কথাগুলো শুনে আমি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম- আপনার কবিতা দেখেছি, পড়েছি, অনেক ভালো কবিতা। আগামী সংখ্যায় ছাপানো হবে। আরমান সাহেব মহাখুশিতে ফোনটা রেখে দিলেন। আমিও নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচলাম।
পরের মাস। বেলা অবেলা প্রকাশিত হলো। আরমান সাহেবের কবিতাটাও যথাযোগ্য মর্যাদায় ছাপানো হয়েছে। ফোন করে জানালাম পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। আপনার লেখক কপি কোথায় পৌঁছে দেব। বললেন কাঁটাবনের ওই বইয়ে দোকানে দিলে আমি সংগ্রহ করে নেব। আমি কপি পৌঁছে দিলাম।
এরপর দু’তিন দিন চলে গেল। আরমান সাহেব আর ফোন করেন না। একদিন সন্ধ্যায় অফিসে কাজ করছি। দেখি ফেসবুকে আরমান সাহেবের ম্যাসেজ। ওপেন করে দেখে তো আমি অবাক। ম্যাসেজের সঙ্গে একটা ছবিও পাঠিয়েছেন। আরও অবাক হলাম। পরে দেখি আমাকে ফেসবুক থেকে আনফ্রেন্ড করেছে।
কিছুক্ষণ পর ফোন করলাম। কারণ, কী জানার জন্য? কবি তো ফোন রিসিভ করেন না। কয়েকবার ট্রাই করলাম। ফোন যায়, কিন্তু রিসিভ করেন না। কোনকিছুরই হিসেব মিলাতে পারছি না।
অফিসের কাজ শেষ করে আবার ফোন দিলাম। প্রথমবার কেটে দিল। ২য় বার ফোন রিসিভ করেই কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলতে শুরু করলেন- আপনি আমার কবিতা ছাপলেন কেন? এই কবিতা ছেপে আমার সব অর্জন বিসর্জন করে দিয়েছেন আপনি? আপনি আমার অনেক বড় ক্ষতি করেছেন। আপনি কেমন সম্পাদক?
শুনুন আমার কথা- আপনার কবিতা তো ছাপাতে দিয়েছেন।
হু দিয়েছি।
আপনার কবিতার বানান কি ভুল হয়েছে?
না।
কোন লাইন কি বাদ পড়েছে?
না।
তো সম্পাদক হিসেবে আমার অপরাধ কি?
আপনি কেন বুঝতে পারছেন না। আপনাকে একটা ছবি দিয়েছি। আপনি দেখেননি?
হ্যাঁ দেখেছি। ছবিতে কবি আল মাহমুদের হাত থেকে একজন ক্রেস্ট নিচ্ছেন।
হ্যাঁ, সমস্যা তো ওখানে। আমার কবিতার পাশে যার কবিতা ছেপেছেন তিনি সেই ব্যক্তি। যিনি আল মাহমুদের হাত থেকে ক্রেস্ট নিচ্ছেন। ওই ব্যক্তির কবিতার সঙ্গে আমার কবিতা ছাপলেন কেন? আপনি জানেন না আল মাহমুদ কোন ঘরাণার কবি?
আমি বাকরুদ্ধ…
চলবে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ