বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন

করোনা সংক্রমণ বাড়ছেই, টেস্ট ফি নির্ধারণ

নিউজ ডেস্ক / ১১৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০
ফাইল ছবি

 

আহমেদ মুকিম

নভেল করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) সংক্রমণ লাগামহীন গতিতে বাড়ছে। মৃত্যু সংখ্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সংক্রমণ রোধ আর মৃত্যু কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে করোনা টেস্টের ফি নির্ধারণ করেছে সরকার। বুথে ২০০ টাকা আর বাসায় গিয়ে নমুনা নিলে ৫০০ টাকা ফি দিতে হবে। করোনা মহামারী এই পরিস্থিতিতে সরকারের নেওয়া এমন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞগন। তাদের মতে, করোনা ফি বাতিল করে বেশি বেশি টেস্টের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। নইলে করোনায় চরম মুল্য দিতে হবে মানুষের জীবন দিয়ে। আর টেস্টের ফি নির্ধারনে কারনে করোনা বিস্তারের সঠিক চিত্র আর পাওয়া যাবে বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞগন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনাভাইরাস বিষয়ক নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান,মহামারি করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে দেশে গত একদিনে আরও ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটি কেড়ে নিয়েছে এক হাজার ৮৪৭ জনের প্রাণ। একই সময়ে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরও তিন হাজার ৬৮২ জন। ফলে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ৪৫ হাজার ৪৮৩ জনে। গত সোমবার নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন চার হাজার ১৪ জন। এটিই একদিনে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ শনাক্ত। এর আগে গত ১৭ জুন সর্বোচ্চ শনাক্ত ছিল চার হাজার আট জন।
গতকাল তিনি জানান, ৬৬টি ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার তথ্য তুলে ধরে বলেন, করোনাভাইরাস শনাক্তে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৮ হাজার ৮৬৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষা করা হয় ১৮ হাজার ৪২৬টি নমুনা। এ নিয়ে দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো সাত লাখ ৬৬ হাজার ৪৬০টি। নতুন নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও তিন হাজার ৬৮২ জনের মধ্যে। ফলে শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ৪৫ হাজার ৪৮৩ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন আরও ৬৪ জন। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৮৪৭ জনের। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন আরও এক হাজার ৮৪৪ জন। এতে মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৫৯ হাজার ৬২৪ জনে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার সঠিক পথে হাটছে না। করোনা টেস্টের ফি নির্ধারণ করা সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। প্রতিদিন করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। তার কারন সঠিক সময় করোনা টেস্ট বৃদ্ধি করা হয়নি। টেস্টে বিড়ম্বনার কারনে মানুষ টেস্ট করতে যান না। উপসর্গ দেখা দিলেও তা গোপন করছে। চেস্ট ফি নির্ধারন করাতে মানুষ আরো নিরুৎসাহিত হবে। টেস্ট করাতে আসতে চাইবে না।
তিনি বলেন, টেস্ট ফি বাতিল করতে হবে। সাধারন মানুষকে টেস্ট করাতে আরো উৎসাহিত করতে হবে। কোন বিড়ম্বনা ছাড়াই টেস্ট নিশ্চিত করাতে হবে। নইলে করোনা সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হবে না। আগামী দিনগুলোতে আরো কঠিণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে।
করোনা টেস্টের ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই ফি অন্যায্য। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সব বিশেষজ্ঞ করোনা সংক্রমণ রোধে টেস্ট বৃদ্ধি করাকেই প্রধান উপায় বলছেন, সেখানে টেস্ট করাতে ফি ধার্যের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, এতে নিম্নআয়ের মানুষেরা উপসর্গ থাকার পরও করোনা পরীক্ষা করাতে পারবেন না।তাদের চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন করা যাবে না। এতে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকবে।
এদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ অধিশাখা থেকে গত সোমবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আরটি-পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নির্ণয় করা হয়। বর্তমানে এ পরীক্ষা সরকার বিনামূল্যে করার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে কোনো উপসর্গ ছাড়াই অধিকাংশ মানুষ এ পরীক্ষা করানোর সুযোগ গ্রহণ করছেন। এ অবস্থায় কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য অপ্রয়োজনীয় টেস্ট পরিহার করার লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের গত ১৫ জুনের এক স্মারকের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে আরটি-পিসিআর পরীক্ষার জন্য ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করা হলো। সরকারি সব হাসপাতালের জন্য এ ফি প্রযোজ্য হবে।
কোন প্রেক্ষাপটে ফি নির্ধারণ করতে হলো জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মান্নান বলেন বলেন , জনস্বার্থের কথা চিন্তা করেই এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন যাদের প্রয়োজন নেই তারাও বিনা কারণে একাধিকবার টেস্ট করাচ্ছেন। ফি নির্ধারণের ফলে যাদের প্রয়োজন নেই তারা আর টেস্ট করাতে যাবেন না।
অনেক মানুষের তো ২০০ টাকা দিয়ে টেস্ট করানোর সামর্থ্য নেই? যারা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। তারা কীভাবে টেস্ট করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ২০০ টাকা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। একজন রিক্সাচালক কত টাকা আয় করেন? করোনার মধ্যেও কিন্তু রিক্সা চলছে। সরকার মনে করছে, ন্যূনতম একটা ফি থাকলে যাদের প্রয়োজন নেই, তারা আর টেস্ট করাতে যাবেন না।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটা টেস্টের পেছনে সরকারের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে ২০০ টাকা নিয়ে কতটা এগুবে? বরং ফ্রি থাকলে ধনী-গরীব সবাই টেস্ট করাতে যেতেন। এখন যার খাবারেরই সমস্যা তিনি কীভাবে টেস্ট করাতে যাবেন? সবাই টেস্ট করাতে না গেলে সমাজের আসল চিত্রটা জানা যাবে না। আর টেস্ট করানোর দায়টা তো স্বাস্থ্য বিভাগের। জনগণ বুথে এসে নমুনা দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করছে। তাহলে যে আপনাকে সহযোগিতা করছে, তার কাছ থেকে উলটো পয়সা নেবেন? আর এই সিদ্ধান্তটা অসাংবিধানিকও। সংবিধানে সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবার কথা বলা আছে। এখন এই সেবাটা আর সবার থাকলো না।
ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, এখন শুধু যাদের ফি দেওয়ার ক্ষমতা আছে তারাই করোনা পরীক্ষা করবেন। যাদের সংসার চলছে না, ২০০ টাকা হলে ৫ কেজি চাল কিনতে পারেন- এমন কেউ আর পরীক্ষা করাতে যাবেন না। ফলে সমাজে করোনা বিস্তৃতির সঠিক চিত্রটা আর পাওয়া যাবে না। শুধুমাত্র পয়সাওয়ালাদের মধ্যে কী পরিমাণ বিস্তৃতি লাভ করেছে সেটাই জানা যাবে। সারাদেশের প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে কোনো ধরনের পরিকল্পনার সুযোগও আর থাকলো না।
বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন,ফি নির্ধারণ না করলেই ভালো হতো। বিনা কারণে অনেকেই টেস্ট করাচ্ছেন এটা যেমন সত্যি, তেমনি ২০০ টাকা দিয়ে টেস্ট করানোও অনেকের জন্য কঠিন। এটাও মানতে হবে। তারপরও আমি মনে করি, সরকার তো কতকিছুতেই ভুর্তুকি দিচ্ছে, তাহলে এই টেস্ট ফ্রি রাখলেই ভালো হতো।
বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা হয় ২১ জানুয়ারি। প্রথম দিকে শুধু রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) পরীক্ষা করা হলেও সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এপ্রিলের শুরুতে ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো হয়। প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এরপর ২৯ এপ্রিল প্রথমবারের মতো চারটি বেসরকারি হাসপাতালকে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ দেয় সরকার। পরে আরও কয়েকটি হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু হয়। এসব হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষার জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে বাসায় গিয়ে নমুনা নিলে সাড়ে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৬৮টি ল্যাবে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নমুনা পরীক্ষার কিট সরবরাহ করছে সরকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ