শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন

কুড়িগ্রামে বন্যা, প্রয়োজনের তুলনায় নেই ত্রাণ

নিউজ ডেস্ক / ৪৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০
কুড়িগ্রামের বন্যার ছবি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন। তার ইউনিয়নের পুরোটাই প্লাবিত। দু’দিন আগে পানি কিছুটা কমলেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে আবারও পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রায় চার হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তিনি বরাদ্দ পেয়েছেন মাত্র ৪৫০ পরিবারের জন্য।

তিনি বলেন, ‘এত কম পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে মানুষের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি থেকে মানুষের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।’

গত এক সপ্তাহ ধরে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি থাকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হলেও অনেক এলাকায় তা না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে আবারও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে এর অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদের পানি কমতে শুরু করলেও এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে জেলার চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর, সদর, নাগেশ্বরী উপজেলাসহ ৯ উপজেলার ৫৫ ইউনিয়নে এখনও অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। সরকারি পর্যায়ে ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা বণ্টনে ধীরগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে রয়েছেন পানিবন্দিরা।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি ২৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে তিস্তার পানিও।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, উজানে বৃষ্টিপাতের কারণে ধরলার পানি সামান্য বাড়লেও তা আবারও কমতে শুরু করবে। অন্যান্য নদ-নদীর পানি হ্রাস অব্যাহত থাকবে। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝি আবারও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নে কয়েক হাজার মানুষ গত ৮ দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছেন। তাদের কাজ না থাকায় জরুরিভাবে খাদ্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘পানিবন্দি অন্তত চার হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন হলেও সরকারিভাবে ৪০০ পরিবারের জন্য ৪ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ পেয়েছি যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।’
উলিপুরের বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা বিতরণে ধীর গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসন থেকে ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা এখনও সব এলাকায় পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে।

উলিপুর উপজেলা পরিষদের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান নিজে উপস্থিত থেকে প্রত্যেক ইউনিয়নে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করতে চাওয়ায় এখনও সব বন্যা কবলিত ইউনিয়নে সরকারি ত্রাণ বণ্টন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা কমলেও সীমান্ত ঘেঁষা বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের প্রায় সবকটি পরিবার এখনও পানিবন্দি। সেখানকার লোকজন খাদ্য সংকটে ভুগলেও সেখানে এখনও সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি। একই পরিস্থিতি উপজেলার বজরা ইউনিয়নে।
সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার পরও বিতরণ না করার প্রসঙ্গে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে ত্রাণের মালামাল নিয়ে আসতে পারিনি। আশা করি শনিবার নিয়ে এসে বিতরণ করতে পারবো।’
বজরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম আমিন জানান, দুই দিন আগে সরকারি বরাদ্দ পেলেও তিনি এখনও তা তোলেননি। কারণ জানতে চাইলে এই তিনি বলেন, ‘কেন, তা আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন না। সমস্যা থাকতেই পারে। তারা (সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান) এসে ত্রাণ বণ্টন করবেন। শনিবার মালামাল তুলে ইউনিয়নে বণ্টন করা হবে।’ এই ইউনিয়নে প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি থাকলেও মাত্র ২০০ পরিবারের জন্য বরাদ্দ মিলেছে বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে উলিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন মন্টুর নম্বরে একাধিকবার ফোন দিয়েও বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম -৩ আসনের (উলিপুর) সংসদ সদস্য এম এ মতিন বলেন, ‘এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি শুধু নদী ভাঙন কবলিত ইউনিয়ন পরিদর্শন করে সেখানে সহায়তার কথা বলেছি। এর মধ্যে সাহেবের আলগা ইউনিয়নে নদী ভাঙনে প্রায় ১০০ পরিবার গৃহীন হয়ে ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। আমি সেই পরিবারগুলোকে সহায়তা করে তাদেরকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিচ্ছি।’
ত্রাণ বণ্টনে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের তা নিয়ে গিয়ে বণ্টন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
জেলা দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য মতে, বন্যা মোকাবিলায় জেলায় এ পর্যন্ত ৩০২ মেট্রিকটন চাল ও ৩৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ