শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন

সমুদ্র কন্যা কুয়াকাটা

নিউজ ডেস্ক / ৫০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০

নগরের ইট কাঠ পাথরের তৈরী বড় বড় বাক্সের মত বাড়ি গুলোতে বাস করতে করতে হাঁপিয়ে উঠে নগরের মানুষ। প্রকৃতিকে একটু কাছে থেকে দেখার সুযোগ কম। এজন্য একটু অবসর পেলেই মানুষ ছুটে যায় কোন সবুজ ঘাসে, কোন নদীর পাশে অথবা কোন সমুদ্রের ধারে। প্রকৃতি নিয়ে ভাবনাটা আমার আগে থেকেই। টুক টাক যখনই লিখিনা কেনো প্রকৃতিই প্রাধান্য পেয়েছে বার বার। এশিয়ায় একটি মাত্র সমুদ্র সৈকত আছে যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এক সাথে দেখা যায়। দেখতে মনে হবে যেন সমুদ্রের পেট চিরে সূর্য উদয় হচ্ছে আবার সমুদ্রের বক্ষেই সূর্য হারিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য অবলোকন করা নিঃসন্দেহে ভাগ্যের ব্যপার। আর এই সমুদ্র সৈকতটির নাম হলো কুয়াকাটা যা কিনা সাগরকন্যা নামে পরিচিত। বেড়াই বাংলাদেশের আহবানে মনের কোনে একটা শিহরণ খেলা করে উঠলো – সমুদ্র মানে প্রকৃতির খুব কাছে যাওয়া। এটি এমনই একটি সৈকত যা দেখে মন আপনা আপনি ভাল হয় যায়। সব ক্লান্তি দুর হয়ে যাবে নিমিষেই।

“আনন্দেরই সাগর হতে এসেছে আজ বান।

দাড় ধ’রে আজ বোস রে সবাই, টান রে সবাই টান।।

বোঝা যত বোঝাই করি করব রে পার দুখের তরী,

ঢেউয়ের পরে ধরব পাড়ি – যায় যদি যাক প্রান।।”…

যাচ্ছি বটে, কিছুটা যে সংশয় ছিল না তা নয়। যাবো যে, সব ঠিক ঠাক মতো পাবো কী না? আরও কত প্রশ্ন মনের মাঝে উঁকিঝুঁকি মারছে। তাই বেড়াই বাংলাদেশ যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের দেয়ালে বিস্তারিত জানালো তখন আমার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব অনেকটাই কেটে গেল।

দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে এলো। সন্ধ্যের খানিক পর পৌঁছে গেলাম সদরঘাট। আগে থেকেই বরিশালের লঞ্চ সুন্দরবন ৮ এ বুকিং দেয়া ছিল। কুয়াকাটায় যেতে নৌপথই বেশি ভালো । এতে বিচরণের আরামটা পাওয়া যায়। সবাই ঘুরাফেরা করে অপেক্ষা করছে লঞ্চ ছাড়ার। খানিক পরেই লঞ্চ ছাড়ল। একটু বাইরে তাকিয়ে ঢাকার আকাশকে বিদায় জানাতে থাকি নতুন একটা আকাশ দেখবো সমুদ্র পাড়ে এই আশায়। ঢাকা থেকে বরিশাল নৌপথে আসার পর, এখানেই আমাদের লঞ্চের ভ্রমণ শেষ। আমরা লঞ্চ থেকে নেমে বাইরে আসতেই দেখি কুয়াকাটার বাস দাড়িয়ে। বরিশাল সদরঘাট থেকে কুয়াকাটার সরাসরি বাসে উঠলেও যেই না বাস – তার দুর্দান্ত সব ঝাঁকুনি হয়েছিল আমাদের সঙ্গী। তবে কুয়াকাটার সৌন্দর্য দেখে সেই কষ্ট আর মনে থাকেনা। ততক্ষণে সহযাত্রীরা ভালোই পরিচিত হয়ে গিয়েছি একে অপরের সাথে। উৎসবের আমেজের কারণেই বোধ করি খুব সহজেই পরস্পর আপন হয়ে উঠি। নাম পরিচয়, ভাব বিনিময় হয়ে যায়।

এরপর দপদপিয়া সেতু পার হয়ে কুয়াকাটার দিকে চলতে লাগলো আমাদের ছোট্ট বাসটি। কুয়াকাটা যাবার রাস্তা এখন অনেক সুন্দর। কোথাও ভাঙ্গা নেই। শুধু শেষ ২ কি:মি: রাস্তা খারাপ। এছাড়া পুরো রাস্তাটা একদম পাকা। কোথাও ভাঙগা নেই। যাওয়ার পথের ছবির মতো আঁকা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আগামী দুটো দিন এতো আপন আর শান্তিময় একটা জায়গায় থাকব? আহা কী আনন্দ!!! যাই হোক পর পর ৪টি ফেরী পার হয়ে দুপুরের দিকে আমরা কুয়াকাটা পৌছুলাম। বীচ থেকে মাত্র ১০০ মিটার দুরে বাস থেকে আমরা নামলাম। হোটেল কিংস এ আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রুমগুলো বেশ বড়। সবচেয়ে বড় কথা জানালা দিয়ে বীচ দেখা যায়।

এবার সবাই খানিকটা গুছিয়ে নেই নিজেদের। কেউ কেউ এসেই বীচ এ চলে যাই সমুদ্রকে আলিঙ্গন করতে। ভর-দুপুরের প্রচণ্ড তাপে বীচের বালি তখন আগুন সমান। সময় গড়িয়ে যায় অনেকক্ষণ, আসতে মন চাইছে না কারোরই। কিন্তু গোসল দরকার, খাওয়া দরকার।

আমাদের মধ্যে একজন তার কোন এক বিশেষজ্ঞ আত্মীয়ের কাছ থেকে জানলেন এখানকার খেপুপাড়া রেষ্টুরেন্ট সবচেয়ে ভালো। আমরা খোজ দ্যা সার্চ লাগালাম nnnরেষ্টুরেন্টটির সন্ধানে। প্রায় ১০ টি রেষ্টুরেন্ট (সবগুলোর লোকজন সামনে দাড়িয়ে কি কি পাওয়া যায় তা তোতাপাখির মতো আমাদের শোনাচ্ছিলেন) পার হয়ে পৌছালাম খেপুপাড়াতে। পৌছে ভুল করলাম না। দেখলাম রান্না করা আছে- রুপচাদা, সামুদ্রিক বায়লা, আরো ২/৩ রকমের মাছ আর মাংস। আমাদের একটু হেজিটেট করতে দেখে দোকানী মহিলা ডিপ ফ্রিজ খুলে বললেন কি মাছ খাবেন দ্যাখেন- রান্না করে দেবো। আমরা বেশ বেছে বেছে একটা লাক্ষা মাছ বের করে দিলাম। তিনি আধ ঘন্টা সময় নিলেন। আমরা হাত ধুয়ে টেবিলে বসে আড্ডা দিলাম। আধ ঘন্টা পর মাছ রান্না হয়ে গেলো। মাটির চুলায় রান্না করা মাছ সামনে এলো। পেট ততোক্ষণে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। তাড়াতাড়ি সবাই খাওয়া শুরু করলাম। আহ! মনে হলো রাধুনী তার সমস্ত ভালোবাসা মিলিয়ে রেঁধেছে।

এবার বিশ্রামের পালা।

রাত সাড়ে আট টার দিকে মোটর সাইকেলে করে এখান থেকে বীচ ঘেষে মাইল পাচেক দূরে আমরা লেবুর বন বীচে গেলাম। পূর্ন চাদের আলোতে বীচ ধরে ছুটে চলার সে আনন্দের কোন তুলনা নেই। সেখানে কয়েকটা দোকান আছে যারা তাজা মাছ ফ্রাই করে দেয়। আর কালবিলম্ব নয়। সবাই সবার পছন্দ বলতে শুরু করলো। রান্না হতে প্রায় ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে।

এবার অপেক্ষার পালা। অপেক্ষার সাথে সাথেই শুরু হয় গানের আসর। কেউ কেউ আবার বীচে চাদের সাথে কথা বলতে বলতে সময় কাটিয়ে দিলো। এরপরই ডাক এলো। মন তখন অন্যরকম এক ভালো লাগায় বিলীন। কোরাল মাছ ভুনা, পোয়া মাছ পেয়াজ দিয়ে হালকা ভুনা, চিংড়ি আর কাকড়া ফ্রাই। সাথে লেবুর বনে লেবু। আহ! কি আর বলবো । জেলেদের মাছ রান্না যারা খাননি তাদের বলেও বোঝানো যাবে না।

ক্লান্ত শরীর আর শান্ত মন নিয়ে যার যার রুমে যেয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার চোখেও অনেক ঘুম কিন্তু আমি ঘুমোতে চাচ্ছিনা। অপলক তাকিয়ে আছি সমুদ্রের দিকে। রাত্রি আরো গভীর হলো কখন যে চোখ লেগে এসেছে মনে নেই। হঠাৎ কি মনে করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখি অল্প অল্প আলো ফুটেছে বাইরে। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে হাটতে হাঁটতে বীচে চলে গেলাম। আস্তে আস্তে ভোর হলো, পুব আকাশ ফর্সা করে হাল্কা সোনা রোদ উকি দেয়। সূর্য তখন নতুন বধুর মতো ঘোমটা তুলে দেয় একটু করে।

DSC06639সকালের চা-নাস্তা সেরে আমরা সবাই রওনা দিলাম টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনে যেটা ফাতরার বন নামে আমাদের কাছে পরিচিত। বীচে গিয়ে দেখি আমাদের জন্য বড় একটি বোট অপেক্ষা করছে সমুদ্রের মাঝখানে। আমরা ছোট নৌকা দিয়ে বোটে উঠি। অসাধারন সে জার্নি। যারা কখনও সুন্দরবন যায়নি তারা এখানে সুন্দরবন এর স্বাদ পাবে। সবুজের মাঝে বিশাল সমুদ্র, যে সুখ ছোঁয়া যায় না তার স্পর্শ পাবার নেশাতেই বোধ করি এখানে ছুটে আসা। সবাই যার যার মতো ফটো শুট করছে, ভালোই লাগছে। বোট থেকে সমুদ্রের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে ছিলাম আমি। এদিকে কয়েকজন মিলে গান ধরলো – “ওরে নীল দরিয়া আমায় দেরে দে ছাড়িয়া। বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি, হায়রে কান্দে রইয়া রইয়া।”… আমিও গলা মেলালাম তাদের সঙ্গে। বোট থেকে নেমে ফাতরার বনে যাওয়ার পথে আমরা ছোটো একটা টং এর সামনে থামি। সেখানে চা, কলা, বিস্কুট, পানিসহ আরও কত্ত কিছু বিক্রি করছে গ্রামের এক বৃদ্ধ। আমরা টং এর পাশেরই একটা গাছ থেকে ডাব পেরে খাই। বিরতি শেষে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হয়। টুক টুক করে কথা বলতে বলতে পুরো ফাতরার বন ঘুরে আমরা পৌঁছে যাই সমুদ্রের পাড়ে।DSC06646

ঘোরাঘুরি শেষে, শেষ আমেজের রেশ নিয়ে সবাই ফিরে এলাম আমাদের হোটেল কক্ষে। এবার বিদায়ের পালা। শুনলাম লঞ্চ ধরতে হলে নাকি ২ টার বাস ধরতে হবে। আমরা তাই করলাম। টুকিটাকি কেনাকাটা শেষে কুয়াকাটাকে বিদায় জানিয়ে বাসে উঠলাম। ভালো লাগছে না, কিছুতেই মন চাইছে না ফিরে যেতে। শুধু নীরবে বললাম আমি আবার আসবো। ২ টায় বাস ছাড়লো। বরিশাল পৌছালো সন্ধ্যা ৭ টায়। এরপর সোজা ঢাকার লঞ্চ এ। যান্ত্রিকতার শহর আমাকে আবারো সাদরে গ্রহন করে নিল।

লিখেছেন- তমা সাহা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ